হুগলীর তেলিনিপাড়ায়

গ্রাউন্ড রিপোর্টঃ ঠিক কি ঘটেছিল হুগলীর তেলিনিপাড়ায়?

স্থানীয় বাসিন্দা এবং পুলিশের মতে, কলকাতার চল্লিশ কিলোমিটার উত্তরে হুগলী জেলার এই অংশে যে হিংসা ঘটে, সেটা ছিল পড়শী এলাকার মুসলমান বাসিন্দাদের ওপর এক পরিকল্পিত এবং একের পর এক নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে বাস্তবায়িত আক্রমণ।
হুগলীর তেলিনিপাড়ায় সংগঠিত সাম্প্রদায়িক আক্রমণ নিয়ে এই গ্রাউন্ড রিপোর্টটি প্রথম প্রকাশ করা হয়েছিল ইংরেজি ভাষায় দ্য অয়্যারে। লেখক হিমাদ্রি ঘোষ। এটি বাংলায় অনুবাদ করেছেন ধীমান বসাক।
 
প্রতিবেদন – ১৬ মে, হিমাদ্রি ঘোষ
তেলেনিপাড়া, পশ্চিমবঙ্গ — সারা পৃথিবী যখন নতুন করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়ছিল, সেই সময় রাজ্য রাজধানী কলকাতার চল্লিশ কিলোমিটার উত্তরে ভদ্রেশ্বরের শহরতলী এলাকার তেলেনিপাড়া গত ১২মে থেকে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার বিরুদ্ধে লড়ছিল। একসময় চটশিল্পের জন্য খ্যাত তেলেনিপাড়া হুগলী জেলার পুব প্রান্তে ঐ জেলার নামেই নামাঙ্কিত নদীর পাড়ে অবস্থিত, এবং হুগলী লোকসভা কেন্দ্রের অংশ। রবিবার ১০মে-র সন্ধেতে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে একটা ছোট ঘটনা ঘটে, পুলিশী হস্তক্ষেপে তা মিটেও যায়। সোমবার, ১১মে আর কোন ঘটনা ঘটে না। তারপর, মঙ্গলবার, ১২মে-র বিকেলে এলাকায় এক বড় দলবল হাজির হয় এবং বড়মাপের বেছেবেছে হিংসার ঘটনা ঘটে। জেলাশাসক ঐদিনই ১৪৪ ধারা জারী করেন, পাশাপাশি দুটো মহকুমা চন্দননগর এবং শ্রীরামপুরে, এই মহকুমাদুটোতেই ভদ্রেশ্বর এবং তেলেনিপাড়া, ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করা হয়। ১৫মে দ্য ওয়্যার, The Wire, তেলেনিপাড়ার যে এলাকায় হিংসা ছড়িয়েছিল, সেখানে যায়। কলকাতা থেকে গ্র্যাণ্ড ট্র্যাঙ্ক (জি টি) রোড ধরে গাড়ি করে যখন আমরা যাচ্ছি, ভদ্রেশ্বর থেকে ডানদিকে মোড় নিয়ে তেলেনিপাড়ার দিকে যাবার ঠিক আগেই, বাবুর বাজার মোড়ে একটা পুরো পুড়ে যাওয়া দোকান আমাদের চোখে পড়ে। কালো হয়ে যাওয়া দেওয়ালে তখনও ‘সাদ’ কথাটা পড়া যাচ্ছে। ভদ্রেশ্বর দমকল অফিসের উলটো দিকে একটা মাজারে (মুসলিম ধর্মীয় স্থান) ভাঙচুর হয়েছে; রাস্তা থেকে ভেতরে ইঁটের ভাঙা টুকরো এবং মাটিতে পড়ে থাকা ছেঁড়া পতাকা আমাদের চোখে পড়ে। হুগলীর তেলিনিপাড়ায় ভদ্রেশ্বরের পরিবেশ শান্ত, যদিও বাজার পেরনোর সময়ে লোকজনকে আমরা তেলেনিপাড়ার ঘটনা নিয়ে আলোচনা করতে শুনেছি। কিন্তু যেই ডানদিকে বাঁক নিয়ে তেলেনিপাড়া ঘাট অবধি চলে যাওয়া দিনেমারডাঙা স্ট্রীটে ঢুকলাম, বেশ বোঝা গেল পরিবেশ পালটে গেল। এই রাস্তাটা পুলিশ আংশিকভাবে ব্যারিকেড করে রেখেছে। তেলেনিপাড়ার যত ভেতরে আমরা হেঁটে ঢুকছি, হিংসা যেখানে ঘটেছে সেখানের দিকে যাওয়ার সময়, রাস্তায় লোক তত কমে আসছে। রাস্তায় যেকজন বেরিয়েছে, তাদের মুখেও ভয়ের ছাপ। দিনেমারডাঙা স্ট্রীট যেখানে শেষ হচ্ছে তার কাছাকাছি এক মোড়ে – দিনেমারডাঙা মোড়, তেলেনিপাড়া ঘাটের ঠিক আগেই – আমরা স্পেশালাইজড্ ইন্ডিয়ান রিজার্ভ ব্যাটেলিয়ান (এস আই আর বি) এর পোস্টিং রয়েছে দেখলাম। একজন আমাদেরকে জানালেন যে প্রায় তিরিশজনের একটি বাহিনী এখানে চব্বিশ ঘণ্টাই পোস্টিং থাকছে। দিনেমারডাঙা মোড় থেকে বাঁদিকে একটা রাস্তা এখন বন্ধ গোন্ডালপাড়া জুটমিলের দিকে চলে গেছে, মিলটা দু’বছরের ওপর বন্ধ। মোড় থেকে ডানদিকে একটা ছোট লেন ঢুকে গেছে, আর রাস্তাটা সোজা গিয়ে পড়েছে ফেরীঘাট স্ট্রীটে। রাস্তাটা শেষ হচ্ছে একটু দূরেই তেলেনিপাড়া ঘাটে। জিটি রোড থেকে এই মোড় পর্যন্ত গোটা দিনেমারডাঙা স্ট্রীটে মূলত হিন্দু বাসিন্দারাই বেশি, আমরা প্রথমে সেখানেই ঢুকলাম। হুগলীর তেলিনিপাড়ায় গোটা রাস্তাতেই আমরা কোন ঘরবাড়ি ভাঙা বা সম্পত্তির ক্ষতি দেখিনি, শুধু দিনেমারডাঙা স্ট্রীটের শুরুতেই দুটো আগুনে পোড়া গাড়ি ছাড়া। দ্য ওয়্যার পত্রিকা তার মধ্যে একটা গাড়ির রেজিস্ট্রেশন নম্বর কেন্দ্র সরকারের রোড ট্রান্সপোর্ট এবং হাইওয়ে মন্ত্রকের ওয়েবসাইট থেকে যাচাই করতে পেরেছে। মালিকের নাম গুলাম সারোয়ার আনসারি। অন্য পোড়া গাড়িটার মালিকের নাম বের করা যায়নি কারণ নাম্বার প্লেটটাই পাওয়া যায়নি।   ১২মে-র হিংসা নিয়ে আমরা কয়েকজনের সাথে কথা বলার চেষ্টা করলাম — কিন্তু একই বাধা, “আমি কিছু জানি না”। যখন আমরা এক মুদিখানার মালিককে জিজ্ঞেস করলাম যে তিনি জানেন কিনা গাড়িগুলো কারা পুড়িয়েছে, মহিলা বললেন, ” আমি জানি না”। কখন ঘটনা শুরু হয়েছিল, সে প্রশ্নেও তার একই উত্তর।  

পরিকল্পিত আক্রমণের দৃশ্য বেরিয়ে এল

আমরা তারপর দিনেমারডাঙা মোড় (জংশন) থেকে গোন্ডালপাড়া মিলের দিকে এগোলাম, আর চোখে পড়তে থাকলো ভাঙা দরজা, গলে যাওয়া টেলিভিশন কেবল আর পোড়া উপড়ে আসা ইলেকট্রিক তার নিয়ে একের পর এক মুসলিম বাসিন্দাদের ঘরবাড়ি। ঘরবাড়িগুলোর ভেতরে কয়েকটার ছাদ এবং দেওয়াল উড়ে গেছে ছোট ঘরের মধ্যে গ্যাসের সিলিন্ডার ফেটে যাওয়ায়।
READ  আনন্দবাজার পত্রিকাও কি ইসলামোফোবিয়ায় আক্রান্ত?
এই ক্ষয়ক্ষতি যখন আমরা পরিদর্শন করছিলাম, ঐ হিংসাদীর্ণ লেনের দুটো ঘর থেকে তখনও কালো ধোঁয়া বেরোচ্ছিল। গোটা রাস্তাটা ভর্তি হয়ে আছে ভাঙা জিনিসে — বড় পাথরের টুকরো, লাঠি, লোহার রড আর অসংখ্য ভাঙা বোতলের টুকরোয়, বোতলগুলোর বেশিরভাগের থেকেই কেরোসিনের গন্ধ পাওয়া গেল। আমরা দেখে আশ্চর্য হলাম যে মুসলমানদের ফটোকপির দোকান, মুদিখানা, মাংসের দোকান আগুনে পুড়লেও ঠিক তাদের পাশে থাকা হিন্দুদের দর্জির দোকান আর মুদিখানার দোকান অক্ষত আছে। এই রাস্তাতেই পড়ে রয়েছে পুরো পুড়ে যাওয়া বেশ কিছু ব্যাটারিচালিত রিক্সা, মোটরবাইক, সাইকেল আর একটা টেম্পো। হুগলীর তেলিনিপাড়ায় এই রাস্তার ওপরেই একটা বাড়ি দেখা গেল, দরজায় ‘ওঁ’ লেখা দেখে বোঝা গেল হিন্দুরা থাকেন, অদ্ভুতভাবে একদিকে ভাঙা, অন্যপাশের দেওয়াল অক্ষত। নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্থানীয় জানালেন, “বাড়িটার পাশেই যে বাড়ি ওটা মুসলিমের, ওখানে সিলিণ্ডার বার্স্ট করায় পাশের এই হিন্দুর বাড়িটা এইভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।” ঐখানেই উপস্থিত এক পুলিশ অফিসার ক্ষয়ক্ষতি খতিয়ে দেখছিলেন। তাকে যখন জিজ্ঞেস করা হল যে এই হিংসা কোন বিশেষ সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে করা হয়েছিল কিনা, তিনি একটা দোকানের দিকে দেখালেন এবং বললেন, “দেখুন এই দোকানটার কোন ক্ষতি হয়নি। এবার দোকানের নামটা পড়ুন।” নাম প্রকাশ করা যাবে না এই শর্তে অফিসারটি দ্য ওয়্যার-কে বললেন, “আক্রমণটা হয়েছিল পরিকল্পনা করে এবং কিছু স্থানীয়ও জড়িত ছিল এতে। তা না হলে শুধু বাইরের লোকের পক্ষে এইভাবে বাড়ি বেছে নিয়ে আক্রমণ করা সম্ভব হত না। আর যে পরিমাণ পেট্রল বোমা ব্যবহার হয়েছে তাতে বোঝা যাচ্ছে আক্রমণকারীরা তৈরী হয়েই এসেছিল।” তিনি একথাও বললেন যে ১২মে-র পরে আর কোন হিংসাত্মক ঘটনা ঘটেনি। পরিস্থিতি এখন পুরো নিয়ন্ত্রণে। হুগলীর তেলিনিপাড়ায়   ৫৩ বছর বয়সী মহম্মদ মুস্তাক তার চোখের সামনে ১২মে-র বিকেলে একদল মুখোশধারীর হাতে তার বাড়ি এবং দোকান লুঠ হতে পুড়ে যেতে দেখেছেন। মুস্তাক এলাকার একজন কেবল অপারেটর, একটা ফটোকপির দোকানও তার আছে। “ঐ লোকগুলোর হাতে ছিল লোহার রড, পাথর আর পেট্রল বোমা, মুখে ‘জয় শ্রীরাম’ আওয়াজ। ওরা আমাদেরকে ধ্বংস করতে এসেছিল। আমার নতুন জেরক্স মেশিন ওরা পুড়িয়ে দেয়। আমি হাত জোড় করে ওদের কাছে আবেদন করেছি, কিন্তু ওরা শোনেনি। এখন আমাদের কিছুই নেই, পরনের কাপড়টুকু ছাড়া”, মুস্তাকের চোখ তখন ছলছলে, গলা ধরে আসছে। আমরা গেলাম মুস্তাকের ৮৩ বছর বয়স্ক বাবার কাছে, রাস্তার একটা কোণে তিনি বসেছিলেন। আমাদের হাত ধরে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়লেন। কিছু বলতে পারলেন না। মুস্তাকের স্ত্রী শাবানা খাতুন, দ্য ওয়্যার-কে জানালেন, ” আমাদের যে ফটোকপির দোকান পোড়ানো হয়েছে, সেটা ছাড়াও আমাদের দুটো দোকান ঘর আছে, যেগুলো হিন্দুদেরকে ভাড়া দেওয়া আছে, সেগুলোর কিছু হয়নি। আর কী প্রমাণ দিতে হবে এটা বুঝতে যে এই হিংসার লক্ষ্য ছিলাম আমরা (মুসলিমরা)?” হুগলীর তেলিনিপাড়ায় স্থানীয়রা অভিযোগ করলেন যে পুলিশ ব্যবস্থা নিয়েছে অনেক দেরী করে, ততক্ষণে অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে। মহম্মদ আনসারি, যার বাড়িও আংশিক পুড়ে গেছে পেট্রল বোমার আগুনে, পাথরও ছোঁড়া হয়েছে, তিনি বললেন, “গোটা ঘটনাটা শুরু হয় ১২মে দুপুর সাড়ে বারোটা থেকে একটার মধ্যে। আমরা খবর পাই যে গোন্ডালপাড়া মিলের দিক থেকে একদল সশস্ত্র লোকজন মুসলিম এলাকায় ঢুকেছে এবং বাড়িতে পেট্রল বোমা ছুঁড়ছে। আমি ১০০ নম্বরে ফোন করি পুলিশকে জানাতে। তারপর ফোন করি ভদ্রেশ্বর পুলিশকে, এবং গোটা পরিস্থিতিটা জানাই। আমার ভাই দমকলে খবর দেয়। কিন্তু পুলিশ আসে আড়াইটের পর। ততক্ষণে অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে। তাও প্রথমে মাত্র ১০-১২ জন পুলিশ এসেছিল। সশস্ত্র দলবলেরা পুলিশকেও আক্রমণ করে, পাথর ছোঁড়ে। যখন আরও পুলিশ আসে, বেলা চারটে তখন, ক্ষতি যা হবার হয়ে গেছে।”  

একটি ছোট ঘটনা থেকেই শুরু দলবদ্ধ আক্রমণ

এক অবসরপ্রাপ্ত জুটমিল শ্রমিক এস কে শামসুদ্দিন আমাদেরকে বললেন যে ঘটনার সূত্রপাত হয় রবিবার ১০মে-র সন্ধেয়, তেলেনিপাড়া ঘাটের এক সরকারী শৌচাগার ব্যবহার নিয়ে সামান্য ঝামেলায়। শামসুদ্দিনের প্রতিবেশী রাজকুমার রায় আমাদেরকে বললেন যে, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের এলাকা থেকে কারোর একটা করোনায় সংক্রামিত হওয়ার খবর আসে। ভাইরাস ছড়িয়ে যাবে এই আতঙ্কে, হিন্দুদের কেউ কেউ ঐ শৌচাগার ব্যবহার করতে মুসলিমদেরকে আটকান, এর থেকে একটা ছোট ঝামেলা হয়। আরেকজন স্থানীয় দীনেশ সাউ জানালেন, এই ঝামেলা রবিবার সন্ধেতে শুরু হয়ে রবিবার রাতেই পুলিশি হস্তক্ষেপে মিটে যায়, তারপর সোমবারেও কিছু ঘটেনি। সাউয়ের কথায়, “কেউ ভাবতেই পারেনি, এই করোনাভাইরাস ইস্যু নিয়ে পরের দিন দাঙ্গা ঘটে যাবে।”
READ  টিকিয়াপাড়া কাণ্ডের 'মূল কাণ্ডারি' বিজেপি নেতার ছোট ভাই, টুইট করে জানালো হাওড়া পুলিশ
হিংসাত্মক ঘটনা ঘটার সময় শামসুদ্দিন ঐ সশস্ত্র দলকে গেন্ডালপাড়ার মুসলিম বসতির দিকে যাওয়া থেকে আটকানোর চেষ্টা করেছিলেন বলে জানালেন, কিন্তু তাদের মধ্যে থেকে একজন তাকে থাপ্পড় লাগায়। তার কথায়, “হিন্দু গোয়ালা ভায়েরা তাদেরকে থামানোর অনেক চেষ্টা করে, তারা আমাদেরকে সাহায্যও করে অনেক। নাহলে আরও বড় ঘটনা ঘটতো।” গোন্ডালপাড়ার পরে আমরা যাই ফেরিঘাট স্ট্রীটে, জায়গাটা ভদ্রেশ্বর পৌরসভার ৯নম্বর ওয়ার্ডের মধ্যে পড়ে। ওখানে পৌঁছতে একটা সরু কালভার্ট পেরোতে হয়, কালভার্টটা মসজিদ রোড আর দিনেমারডাঙা মোড়ের সংযেগকারী। কালভার্টের নীচের নালায় আমরা কয়েকটা গ্যাস সিলিন্ডার আর একটা মোটরসাইকেল পড়ে থাকতে দেখি। হুগলীর তেলিনিপাড়ায় ঐ কালভার্টের পাশেই থাকা দুই এসআইআরবি-র কর্নীর সাথে আমরা কথা বলি, যারা ওখানে টানা ১১ ঘন্টারও বেশি ডিউটি করছেন। তাদের একজন জানান, “আপনারা রিপোর্টাররা তো জায়গাটা ঘুরে দেখছেন। দেখতেই পাচ্ছেন কাদের সম্পত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এত পেট্রল বোমা সেদিন ছোঁড়া হয়েছে যে গোটা রাস্তাটা পুরো কাঁচের টুকরোও ভর্তি ছিল। আমার ধারণা ওরা অ্যাসিডও ব্যবহার করেছে, কারণ একটা জায়গায় ছোঁড়া বোতল থেকে দেওয়ালের রং পাল্টে গেছে।” তার সহকর্মী বললেন, “আমাদের সম্বল শুধু লাঠি এবং মারণক্ষমতাহীন (নন লেদাল) কিছু অস্ত্র। এই দিয়ে আমরা লাঠি, ঢাল নিয়ে সজ্জিত ৫০০-৬০০ জনের এক সশস্ত্র দলকে আমরা নিয়ন্ত্রণ করবো কী করে?” আমরা উত্তর তেলেনিপাড়ার আরও গলিঘুঁজিতে ঢুকলাম। গলিগুলোতে হিংসার দাগ লেগে রয়েছে। বাসিন্দারা তাদের জীবনের জন্য ভীত। আমরা বিশ্বনাথ শিকদারের সাথে কথা বলি, তিনি তখন একটা ওষুধের দোকানের সামনে খবরের কাগজ পড়ছিলেন, দোকানের ওপরেই তার বাসা। শিকদার আমাদের বললেন, “তেলেনিপাড়ায় এর আগেও দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে ছোটখাটো সংঘর্ষ ঘটেছে। কিন্তু এবারের ঘটনা বীভৎস। দুই সম্প্রদায়ই এখন ভয় নিয়ে বাস করছি।”  

ওরা এসেছিল নদীর ওপার থেকে

তেলেনিপাড়ার এক বাসিন্দা, এম ডি সালিম এক ভয়ঙ্কর কথা শোনালেন। “ওরা সংখ্যায় এত বেশি ছিল, আর এত অস্ত্রশস্ত্র ছিল যে আমরা ওদের ঠেকাতেও পারিনি।” একটা পোড়া বাড়ি, যেটা পরপর পাঁচটা বাড়ির একটা অংশ, সবার দেওয়ালই কমন, সেটা দেখিয়ে বললেন, “এই বাড়িটায় আগুন ধরেছিল, ভেতরে একটা সিলিণ্ডার ছিল। আমি ভেতরে ছুটে গিয়ে সিলিন্ডারকে বাইরে বের করে বালিচাপা দিই। আমি কয়েক মিনিট দেরী করে এলে এই পাঁচটা বাড়িই আগুনে জ্বলে যেত।” হিংসার ঘটনার জায়গাটা তিনদিক জমি আর একদিক নদী দিয়ে ঘেরা। গোন্ডালপাড়া মিলটা হুগলী নদীর পাড়েই। নদীর অপর পাড়ে জগদ্দল, যেটা ব্যারাকপুর জেলায় পড়ে। জগদ্দল ব্যারাকপুর লোকসভা কেন্দ্রের অংশ, এখন সেখানকার এমপি হলেন বিজেপির স্থানীয় প্রভাবশালী নেতা অর্জুন সিং। সালিমের অভিযোগ, অর্জুন সিং-এর লোকজন ছোট ছোট নৌকোয় করে গোন্ডালপাড়া মিলের দিক থেকে তেলেনিপাড়ায় ঢুকেছে। হুগলীর তেলিনিপাড়ায় আমরা দেখতে পেলাম ফেরিঘাট স্ট্রীটের একটা বাই-লেনে অবস্থিত পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর এম ডি নিহালের বাড়িও ক্ষতিগ্রস্ত। তার বাড়ির একটা দেওয়ালে বড় ফাটল, পাশের বাড়ির সিলিণ্ডার ফেটে সেটা হয়েছে। নিহালের বাড়ি তালাবন্ধ ছিল। স্থানীয়রা জানালেন নিহাল এখন বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে বসিরহাটে কর্মরত, ঐ কারণে পরিবার নিয়ে ওখানেই থাকেন। ঐ বাইলেনেরই শেষে আমাদের দেখা হল ৫০ বছর বয়স্ক জুলফিকর আনসারির সঙ্গে। জুলফিকর গোন্ডালপাড়া জুটমিলের প্রাক্তন শ্রমিক। তার বাড়িও পুড়েছে, বিশেষ করে ক্ষতি হয়েছে তিনতলায় তার বাবার ঘরটা। আনসারি দ্য ওয়্যার-কে জানালেন, তার পাশের বাড়িটাই স্থানীয় কাউন্সিলরের, “কিন্তু আক্রমণ ঠেকাতে কেউ এগিয়ে আসেনি। ওরা আমার বৃদ্ধ বাবাকে আঘাত করলো, আমি জোড় হাত করে ওদেরকে আবেদন করলাম, কেউ মানলো না। ওরা আমাদের গরুও নিয়ে গেছে। কাজ চলে যাওয়ার পর ওটা ছিল আমার আয়ের একমাত্র উৎস।”
READ  পালঘর মব লিঞ্চিং, ন্যায় বিচার এবং রাজনীতি
দ্য ওয়্যার ঐ ওয়ার্ডের কাউন্সিলর চিত্রা চৌধুরীকে জিজ্ঞেস করেছিল যে প্রতিবেশীরা আক্রান্ত হওয়ার সময় কেন তিনি সাহায্য করেননি। চৌধুরী এবং তার স্বামী দুজনেই কংগ্রেস করেন, এবং দুজনে মিলিয়ে একটানা ২৫ বছরেরও বেশি কাউন্সিলর আছেন। তিনি বললেন, “আমার ছেলে সেই সময় আমার কাছেই ছিল। আমার তখন কী করা উচিত, নিজেকে, ছেলেকে বাঁচানো, না অন্যদের বাঁচানো? আপনি কি চান বোমা ছোঁড়াছুঁড়ির মধ্যে আমি গিয়ে দু’পক্ষের মাঝখানে দাঁড়াই?” যখন আমরা জিজ্ঞেস করলাম যে একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসাবে এটাকে কি তিনি কর্তব্য হিসাবে দেখেন না, অন্তত ক্ষতিগ্রস্তদের সঙ্গে সাক্ষাত করা, তিনি নিস্পৃহভাবে বললেন, “আমি কি কিছু করতে পারবো, তাহলে আমি ক্ষতিগ্রস্তদের সঙ্গে দেখা করে করবোটা কী?” হুগলীর তেলিনিপাড়ায় স্থানীয়রা জানালেন, একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বও এলাকায় আসেননি। অনেকে অভিযোগ করলেন, স্থানীয় চন্দননগর বিধানসভা কেন্দ্রের, যার মধ্যে ভদ্রেশ্বর-তেলেনিপাড়া পড়ে, বিধায়ক তৃণমূলের ইন্দ্রনীল সেন, যিনি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তথ্য সংস্কৃতি দপ্তরের রাষ্ট্রমন্ত্রীও, কেবল নির্বাচনের সময়ই সক্রিয় থাকেন। দ্য ওয়্যারের পক্ষ থেকে তাকে করা বেশ কয়েকটা কল এবং টেক্সট মেসেজের উত্তর এই প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত আসেনি। দ্য ওয়্যার-এর সাথে কথাবার্তায় চন্দননগরের পুলিশ কমিশনার হুমায়ুন কবির জানালেন, “রবিবার ১০মে-র ঘটনা ছিল স্বতঃস্ফূর্ত, কিন্তু মঙ্গলবার ১২মে-র ঘটনা ছিল পূর্ব-পরিকল্পিত ও তাকে এক এক করে সংঘটিত করা হয়। চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে আমরা ৯১জনকে গ্রেফতার করেছি এবং আদালতে তুলেছি, কোর্ট ১৪ দিনের জুডিশিয়াল কাস্টডি দিয়েছেন। পরের দিন আরও ৩৫জন গ্রেফতার হয়েছে।”  

আক্রান্ত হয়েছে বলে ভুয়ো ন্যারাটিভ বানানো এবং তার মুখোশ উন্মোচন

হুগলী লোকসভা কেন্দ্রের বিজেপি এমপি লকেট চ্যাটার্জীর সাথে আমরা যোগাযোগের চেষ্টা করি। কিন্তু এখনও পর্যন্ত তিনি আমাদের কলের কোন উত্তর দেননি। বিজেপির একজন জাতীয় সাধারণ সম্পাদক কৈলাস বিজয়বর্গীয়, যিনি দলের পক্ষ থেকে পশ্চিমবঙ্গের পর্যবেক্ষক, ১২মে-র বিকেলে চ্যাটার্জীর একটা ভিডিও ট্যুইট করেন, যাতে লকেট চ্যাটার্জীকে দাবী করতে শোনা যায়, “হিন্দুদের ঘরবাড়ি জ্বালানো হয়েছে। স্থানীয় মানুষের কাছ থেকে আমি অনেক আর্তির কল পাচ্ছি। এটা একটা একতরফা যুদ্ধ।” তিনি রাজ্য সরকারী প্রশাসনের তীব্র সমালোচনাও করেন এবং বলেন, “রাজ্য প্রশাসন এক বোবা দর্শক, আর তেলেনিপাড়া জ্বলছে।” সোশাল মিডিয়াতেও বহু ভুয়ো খবরও ছড়িয়ে পড়ে, যার বক্তব্যও ঐ লাইনেই যে তেলেনিপাড়ায় হিন্দুরা বিপদগ্রস্ত। উইকিনিউজে ২০২০-র ১২মে শুরু হওয়া একটা পেজের শিরোনাম হয় – “২০২০ তেলেনিপাড়া হিন্দু-বিরোধী কার্যক্রম”। একটা ভুয়ো সংবাদ ওয়েবসাইট-ও, যার নাম দেওয়া হয় বাংলার সর্বাধিক প্রচারিত সংবাদপত্র আনন্দবাজার পত্রিকার নামে, মিথ্যা এবং উত্তেজক খবর করে তেলেনিপাড়ার ঘটনা নিয়ে। ‘সংবাদ’ সাইটা শুরু হয়েছিল ৭এপ্রিল, এখন সেটি আর নেই। হুগলীর তেলিনিপাড়ায় ইণ্ডিয়া টুডে-র এক ফ্যাক্ট চেকিং টীমও লক্ষ্য করে যে অন্য দেশের একটি সম্পর্কহীন ঘটনার ছবি তেলেনিপাড়ার হিন্দু-বিরোধী দাঙ্গার বলে চালানো হচ্ছে এবং সোশাল মিডিয়ায় ভালরকম ছড়িয়েছে। ট্যুইটার এবং ফেসবুক ব্যবহারকারীরাও সেটা ছড়িয়েছেন। ইন্ডিয়া টুডে মিথ্যাটাকে ফাঁস করে এবং বলে: ছবিগুলো পাকিস্তানের, যেখানে দেখা যাচ্ছে হিন্দুূদের মারধোর করা হচ্ছে, তাদের বাড়িতে আগুন ধরানো হচ্ছে। দ্য ওয়্যার তিনঘন্টারও বেশি সময় তেলেনিপাড়ার সন্ত্রাসদীর্ণ এলাকায় কাটায় এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের অনেক মানুষের সঙ্গে কথা বলে। বাস্তবে আমরা যা দেখতে পাই সেটা হচ্ছে মুসলিম বসতিতেই সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে। আমরা এও দেখি যে রাজা বাজার এলাকায় কয়েকটি হিন্দু বাড়িও আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তেলেনিপাড়ায় আমরা যা সবটা দেখি, তাতে আমাদের প্রাথমিক মূল্যায়ন হল, ১২মে যা ঘটেছে তা এক পরিকল্পনা মাফিক আক্রমণ এবং তাকে পরপর কাজে পরিণত করা হয়েছে। সরেজমিনে অনেক তথ্যপ্রমাণ এটা দেখিয়ে দেয় যে মুসলিম বাড়ি এবং দোকানগুলোকে আলাদা করে বাছা হয়েছে এবং পরিকল্পনামাফিক লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ যে আক্রমণ চালিয়েছে ‘বহিরাগত’ লোকজন, যাদেরকে এলাকার সাথে পরিচিত কয়েকজন স্থানীয় সাহায্য করেছে।

প্রথম প্রকাশ- The Wire

লেখক- Himadri Ghosh

অনুবাদক- Dheeman Basak

এই প্রতিবেদন শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

CAPTCHA